হাওজা নিউজ এজেন্সি: শহীদ উস্তাদ মুর্তজা মুতাহহারি (রহ.) তাঁর এক গ্রন্থে “বিবাহ বিষয়ে ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি” প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নোত্তরমূলক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন, যা বিশেষভাবে শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
তিনি বলেন, যতক্ষণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল কামনাজনিত, অর্থাৎ যৌন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই তারা একে অপরকে কেবল একটি উপকরণ হিসেবে দেখবে। যৌন সম্পর্ক নিজেই একটি প্রাণিজ ও প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি। যৌন তৃষ্ণা মেটানোর জন্য, নারী পুরুষের কাছে একে অপরের কাছে একটি মাত্র উপকরণে পরিণত হয়, এবং পুরুষও নারীর কাছে কেবল একটি উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক, পারিবারিক কেন্দ্র ও পারিবারিক দর্শনের মূল বিষয় হলো— যৌন প্রবৃত্তির ঊর্ধ্বে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন, যা দুই ব্যক্তির মধ্যে গড়ে ওঠে। এই বন্ধনে একে অপরের ব্যক্তিত্বকে মূল্য দেওয়া হয় এবং একে অপরের চরিত্র, মানসিকতা ও আত্মিক গুণাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। এটি সেই বন্ধন যা যৌন প্রবৃত্তির সীমার বাইরে গিয়ে সম্পর্ককে গভীরতা ও স্থায়িত্ব দেয়।
এর অর্থ হলো, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসে, সম্মান করে এবং একে অপরের সঙ্গে মানসিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন গড়ে তোলে। এমনকি বার্ধক্যে পৌঁছে যখন যৌন প্রবৃত্তি সম্পূর্ণভাবে দুর্বল বা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখনও তাদের মধ্যে পারিবারিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্পর্কের গভীরতা বজায় থাকে—বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর ও দৃঢ় হয়।
এটাই সেই প্রথম স্তর, যেখানে মানুষ নিজকেন্দ্রিক স্বার্থ ও ব্যক্তিত্বের সীমারেখা ছাড়িয়ে গিয়ে অন্যের প্রতি দায়িত্ব ও মনোভাব গড়ে তোলে। এই স্তরেই মানব সমাজে নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
এই কারণেই ইসলাম বিবাহকে নৈতিক মর্যাদা দিয়েছে, যদিও তা একটি কামনাজনিত বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, প্রাকৃতিক ও কামনাভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও একমাত্র বিবাহই নৈতিক মাত্রা লাভ করে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খাদ্য গ্রহণ কখনো নৈতিক বিষয় হয়ে ওঠে না; কিন্তু বিবাহ স্বাভাবিক ও কামনাজনিত হলেও নৈতিক ও আত্মিক শিক্ষা ও বিকাশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মানুষের কামনাজনিত প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে অন্যান্য যেকোনো প্রবৃত্তি পূর্ণ হলে তা মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবস্থায় কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু যৌন প্রবৃত্তির পূর্ণতা, অর্থাৎ বিবাহিত সম্পর্কের মাধ্যমে যৌন আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা মানুষের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্যই ইসলামে বিবাহকে একটি সুন্নত (প্রচলিত ও প্রিয়) এবং মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
শহীদ উস্তাদ মুর্তজা মুতাহহারি (রহ.) বলেন, বিবাহ শুধু যৌন তৃষ্ণা মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও আত্মিক বিকাশকে মজবুত করে। এটি মানুষের প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি এবং নৈতিক শিক্ষা একত্রিত করার একমাত্র মানবিক ও ইসলামী ব্যবস্থা।
সূত্র: শহীদ উস্তাদ মুর্তজা মুতাহহারি (রহ.), তালিম ও তারবিয়াত দা’র ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৬৫–১৬৬।
আপনার কমেন্ট